Last Updated on : May 5, 2026
প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদ তথা চর্যাগীতি বাংলা ভাষার অতুলনীয় সম্পদ। এর পুথি প্রথম আবিষ্কার করেন মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় নেপালের রাজ গ্রন্থাগার থেকে ১৯০৭ সালে। এই পুথির গানগুলি ১৯১৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে “হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোহা” নামে প্রকাশিত হয়।
কাআ তরুবর পঞ্চ বি ডাল, লুইপাদ, চর্যাপদ 1
মূলপদ
॥ রাগ পটমঞ্জরী—লুইপাদানাম্ ॥
কাআ তরুবর পঞ্চ বি ডাল।
চঞ্চল চীএ পইঠো কাল॥ ধ্রু॥
দিঢ় করিঅ মহাসুহ পরিমাণ।
লুই ভণই গুরু পুচ্ছিঅ জাণ। ধ্রু॥
সঅল স [মা] হিঅ কাহি করিঅই।
সুখদুখেতেঁ নিচিত মরিআই॥ ধ্রু॥
এড়িএউ ছান্দক বান্ধ করণক পাটের আস।
সুন্নপাখ ভিড়ি লাহু রে পাস॥ ধ্রু॥
ভণই লুই আম্হে ঝাণে দিঠা।
ধমণ চমণ বেণি পিণ্ডি বইঠা॥ ধ্রু॥
ভাবানুবাদ
কায়ারূপ তরুবর, পাঁচ তার ডাল।
চঞ্চল চিত-মাঝে পশে আসি কাল।।
দৃঢ় করি মহাসুখ কর পরিমাণ।
লুই ভণে—গুরুকে পুছিয়া ইহা জান ৷
সকল সমাধি দ্বারা কিবা করা যায়।
সুখদুঃখে নিশ্চিত মরিবেই হায়।।
ছন্দের বন্ধন এড় করণের (পারিপাট্য) আশ।
শূন্যতা পক্ষের দিকে লহ তুমি পাশ ।
লুই বলে—ইহা আমি ধ্যানে দেখিয়াছি।
ধমণ চমণ দুই পীড়িতে বসেছি।।
বাচ্যার্থ বা আক্ষরিক অর্থ
১-২ কায় [রূপ] তরুবর। পাঁচটি [তার] ডাল। চঞ্চল চিত্তে কাল প্রবিষ্ট হয়েছে।
৩-৪ দৃঢ় করে মহাসুখ পরিমাণ কর। লুই ভনে, গুরুকে পুছে (=জিজ্ঞাসা করে) জান।
৫-৬ সমাধি-সকল দিয়ে কী হবে, সুখদুঃখে নিশ্চিতভাবে মরতেই হবে (অর্থাৎ ধ্যান-সমাধিতে সুখদুঃখের নিশ্চিত নিবৃত্তি নেই)।
৭-৮ [অতএব] ছন্দের (=বাসনার) বন্ধন (ও) করণের (=ইন্দ্রিয়ের) পটুত্বের আশা এড়াও (অর্থাৎ ত্যাগ কর)। শূন্যতা পক্ষের দিকে ভিড়ে পাশ নাও (ফের)।
৯-১০, লুই ভনে, আমি ধ্যানে (পাঠান্তরে ‘ইশারায় ) [ এই যুগনদ্ধ রূপ] দেখেছি, ধমন-চমন (=নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস ) [-রূপ] দুই পিঁড়িতে বসেছি। ধ্রু=ধ্রুবপদ।
গূঢ়ার্থব্যাখ্যা ৷৷ আলোচনা
গানটিকে টীকাকার মুনিদত্ত ‘মহারাগনয়চর্যা’ অর্থাৎ মহাঅনুরাগের পদ্ধতির রূপে উল্লেখ করেছেন। সহজসাধনার পদ্ধতিগত ইঙ্গিত থাকাতেই বোধ হয় এই নামকরণ। এই গানে সাধনপদ্ধতি ছাড়াও সাধকদের দার্শনিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গী বিশেষভাবে প্রাধান্য পেয়েছে। পদকর্তা লুই বলেছেন যে, আমাদের এই দেহ পঞ্চশাখাবিশিষ্ট তরুর মতো রূপ-বেদনা-সংজ্ঞা-সংস্কার বিজ্ঞান নামক পঞ্চকায়ের সমবায়ে গঠিত। আমাদের মন প্রকৃতি-আভাস দোষে নিয়ত চঞ্চল, মনের এই চঞ্চল অবস্থা থেকেই আমাদের কাল-বোধ জন্মে এবং কাল-বোধ থেকেই প্রবৃত্তিমূলক ভববোধ বা সংসার-জ্ঞানের উৎপত্তি।
এই চঞ্চল চিত্তকে নিঃস্বভাবীকৃত করতে হলে তাকে মহাসুখের মধ্যে বিলীন করতে হবে এবং এই সাধনায় গুরুর নির্দেশ গ্রহণ করা প্রয়োজন। বিবিধ ধ্যান-সমাধির দ্বারা কিছু লাভ হয় না, কেননা এসব সত্ত্বেও সংসারের সুখদুঃখ ভোগ করতে হয় এবং মৃত্যুও সুনিশ্চিত। অতএব সর্ববিধ ইন্দ্রিয়ভোগের আশা পরিহার করে শূন্যতার পক্ষ তথা বাসনানিবৃত্তির পথ অবলম্বন করতে হবে। শুধু প্রবৃত্তিমূলক ভববোধেও সহজানন্দ নেই, শুধু নিবৃত্তিমূলক শূন্যতাতেও সুখ নেই—এই দুইয়ের অদ্বয় সামরস্যেই সহজানন্দরূপ মহাসুখের উপলব্ধি। লুই বলেছেন যে, তিনি ধমন অর্থাৎ নিঃশ্বাসবাহী নাড়ী ও চমন বা প্রশ্বাসবাহী নাড়ীদ্বয়ের স্বাভাবিক নিম্নগা ধারাকে নিয়ন্ত্রিত করে অবধূতীমার্গাসীন হয়েছেন এবং সেই অবস্থায় সহজস্বরূপের যুগনদ্ধ রূপ দর্শন করেছেন। [ড. নির্মল দাশ, চর্যাগীতি পরিক্রমা]
মানুষ এবং মানুষের শরীরকে একটি চর্যায় গাছের সঙ্গে তুলনা দেওয়া হয়েছে । বৃক্ষের সঙ্গে মানবের আত্মীয়তা অতি প্রাচীন। মানব-সভ্যতার আদিমতম স্তরে এই গাছই ছিল মানুষের সবচেয়ে পরিচিত মূক আত্মীয়। পৃথিবীর সবদেশের প্রাচীন সাহিত্যে তাই গাছের কথা আছেই। বৃহদারণ্যক উপনিষদেও বৃক্ষের সঙ্গে মানুষের উপমা দিয়ে বলা হয়েছে, গাছের দেহে যেমন পাতা, বল্কল, রস, কাষ্ঠ, তেমনি মানুষের দেহে লোম, চামড়া, রক্ত এবং হাড় আর মাংসের মজ্জা বৃক্ষের ‘ষড়ঙ্গোপমা’। উল্লিখিত চর্যাপদটিতেও মানুষের এই দেহকে তুলনা করা হয়েছে গাছের সঙ্গে। কায়া-তরুর পাঁচটি ডাল বলার অর্থ আমাদের শরীরের একটি বৃক্ষ, এবং এর পঞ্চস্কন্ধ বা পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়ের পাঁচটি শাখা।
লুইপাদের এই চর্যাটিতে যা বলা হয়েছে তাতে সুগভীর আধ্যাত্মিক দর্শনই প্রধান। আমাদের দেহ এবং পঞ্চ-ইন্দ্রিয় নিয়ে এই আমরা, সাংসারিক বিষয়ের আকর্ষণে এবং প্রভাবে আমাদের চিত্ত চঞ্চল হয়, সেইজন্যই আমরা বিবিধ দুঃখ ভোগ করি এবং শেষে কালকবলিত হই। কিন্তু এই চঞ্চলতা দূর করে মহাসুখ বা নিত্যানন্দ লাভ করবার জন্যে আমাদের ধীরচিত্ত হতে হবে,যোগ ধ্যান সমাধি এসব ক্ষণিক উপায়ের প্রতি গুরুত্ব না দিয়ে ভ্রান্তিবশতই আমরা জগতে প্রত্যক্ষ করেছি, এই বোধটাকে মনে দৃঢ় করে নিয়ে, শূন্যতার সাধনা আমাদের করতে হবে। এই আধ্যাত্মিক উপদেশটিতেই এই চর্যাতে গাছ, গাছের ডালপালা, গুরুকে জিজ্ঞাসা করা, পিঁড়িতে স্থির হয়ে বসা ইত্যাদি রূপকের সাহায্যে বিবৃত হয়েছে। [অতীন্দ্র মজুমদার, চর্যাপদ]
চর্যাটিতে প্রথমে সহজিয়া বৌদ্ধদের চরম শান্তি মহাসুখ পরিমাণ করার কথা বলা হইয়াছে। কালের অধীন অস্থির (চঞ্চল) চিত্ত এই সুখ লাভ করিতে পারে না। চিত্তকে দৃঢ় করিয়া কায়বৃক্ষের যুগনদ্ধরূপ সহজানন্দফল আস্বাদন করিতে হয়। উপায় ‘কুলিশারবিন্দ’ যোগ অর্থাৎ মহারাগনয়। এই ‘নয়’ (সাধনপদ্ধতি) গুরূগম্য। ইহাতে দুষ্কর ব্রতাচরণাদির প্রয়োজন নাই। বুদ্ধ-প্রদর্শিত সমাধিমার্গ, হঠযোগের ছন্দ-বন্ধ-করণ-কপাটাদি ক্রিয়াও মূল্যহীন। কারণ মহাসুখের সাধন সুকর ও সুখকর (‘সুখেন সাধ্যত্বাৎ বোধিঃ’)। সুখ আছে শূন্যতাপক্ষকে (প্রজ্ঞাকরূপিণী নৈরাত্মাকে) আলিঙ্গন করিয়া। রাগ বা কাম ইহাতে পরিত্যক্ত হয় না। ধমন-চমন বা আলিকালির যুগ্ম পীঠে বসিয়া (অর্থাৎ চন্দ্রসূর্যের গতি রুদ্ধ করিয়া) মহাসুখ সাক্ষাৎকার করা যায়। সিদ্ধাচার্য লুইপাদ সেই সব সুখ নিজে অনুভব করিয়াছেন। [জাহ্নবীকুমার চক্রবর্তী, চর্যাগীতির ভূমিকা]
লুই-রচিত এই চর্য্যাটিতে সহজ সাধনের ইঙ্গিত সুস্পষ্ট। তাঁহার বক্তব্য এই যে, যে সকল ইন্দ্রিয় ও প্রবৃত্তি শরীরের সহিতই সহজ, তাহাদের স্বাভাবিক চর্যার মাধ্যমেই অবিকল্প মহাসুখানুভূতি লাভ সম্ভব; এই সুখসাগরে বিলীন হইবার সাধনাই সহজ সাধনা। ডঃ সুকুমার সেন মহাশয়ের মতে, পরবর্তীকালে বৈষ্ণব সাধনায় যে ‘রাগানুগা’ পদ্ধতির কথা বলা হইয়াছে তাহা এই সহজ-সাধন-প্রক্রিয়াটিরই প্রতিধ্বনি। [মণীন্দ্রমোহন বসু, চর্য্যাপদ]
চর্যাপদের বিস্তৃত আলোচনা দেখুন
সাহায্য – মণীন্দ্রমোহন বসু ও নির্মল দাশ


